সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে। বদলেছে জীবনযাত্রা, প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা, মানুষের চিন্তাভাবনা। কিন্তু এই পরিবর্তনের ভিড়ে আমরা কি কোথাও আমাদের মূল্যবোধ, শিষ্টাচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে ফেলছি?
প্রশ্নটা আজ খুব জোরেশোরেই সামনে এসেছে।
সেদিনের শ্রদ্ধাবোধ, আজকের বাস্তবতা
আমার বাবা, মামাদের দেখেছি। তাঁরা স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন। তখন আজকের মতো এত ডিভাইস ছিল না, যোগাযোগের মাধ্যমও ছিল অনেকটাই সাদামাটা। কিন্তু শিক্ষককে সম্মান করার যে সংস্কৃতি ছিল, তা ছিল গভীর। দূর থেকে কোনো শিক্ষককে আসতে দেখলে সাইকেল থেকে নেমে পড়তেন, শিক্ষককে সালাম দিতেন। শিক্ষককে অতিক্রম করার পর আবার সাইকেলে উঠতেন।দৃশ্যটা হয়তো আজকের প্রজন্মের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু আমাদের আগের প্রজন্মের কাছে এটাই ছিল স্বাভাবিক শিষ্টাচার। শিক্ষককে সম্মান করা মানে শুধু একজন মানুষকে সম্মান করা নয়; জ্ঞান, শিক্ষা ও নিজের বেড়ে ওঠার পেছনে থাকা একজন মানুষের অবদানকে স্বীকার করা।
এপিবিএন স্কুলেরই একজন শিক্ষকের কথা মনে পড়ে। বেয়াদবি মনে করবেন না, স্যার। জানতাম, তিনি সিগারেট খান। কিন্তু কখনো তাঁকে প্রকাশ্যে সিগারেট খেতে দেখিনি। একদিন হয়তো ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সিগারেট টানছিলেন। দূরে কোনো শিক্ষার্থীকে দেখতে পেলে সিগারেটটি ফেলে দিতেন। কেন? হয়তো তিনি চাইতেন না, তাঁর শিক্ষার্থীরা তাঁকে এমন অবস্থায় দেখুক। নিজের ব্যক্তিগত অভ্যাসের চেয়ে শিক্ষার্থীদের চোখে নিজের সম্মানটুকু তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আজ সেই দৃশ্য মনে পড়লে ভাবি, সময় কতটা বদলে গেছে! এখন কোথাও কোথাও শিক্ষককে শিক্ষার্থীর সামনে নিজের সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে অসহায় হতে দেখা যায়। তবে সব শিক্ষক বা সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চিত্র এক নয়, এই পার্থক্যটুকুও আমাদের মনে রাখতে হবে।
জেন-জি: সম্ভাবনা আছে, সংকটও আছে
বর্তমান প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জির মধ্যে আমি সম্ভাবনা দেখি। তাদের মধ্যে স্পিরিট আছে, স্বাধীনচেতা মনোভাব আছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস আছে। প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের পরিচিতি বেশি, তথ্য পাওয়ার সুযোগও বিস্তৃত। এগুলো ইতিবাচক দিক।
কিন্তু সমস্যা দেখা দেয়, যখন স্বাধীনচেতা মনোভাব ঔদ্ধত্যে রূপ নেয়, প্রতিবাদ বেয়াদবিতে পরিণত হয়, আর অধিকার আদায়ের ভাষা হয়ে ওঠে অপমান ও হুমকি। সব তরুণকে এক কাতারে ফেলা অন্যায়। এই প্রজন্মের অসংখ্য শিক্ষার্থী মেধাবী, মানবিক, দায়িত্বশীল ও শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু একটি অংশের আচরণ যখন পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই সংকটকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? শুধু শিক্ষার্থী? শুধু পরিবার? নাকি শিক্ষক ও সমাজও এর দায় এড়াতে পারে না?
শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা: প্রতিবাদের নামে অপমান কতটা যৌক্তিক?
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করা, অপদস্থ করা কিংবা লাঞ্ছিত করার যেসব ঘটনার খবর সামনে এসেছে, সেগুলো আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে।
একজন শিক্ষক অন্যায় করতে পারেন। তিনি দুর্নীতি করতে পারেন, শিক্ষার্থীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে পারেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারেন কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতে পারেন। এসব অভিযোগ সত্য হলে তাঁর বিরুদ্ধে অবশ্যই তদন্ত হতে হবে এবং প্রমাণিত অপরাধের জন্য আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু অভিযোগের বিচার আর কাউকে অপমান-অপদস্থ করা এক বিষয় নয়।
সপ্তম কিংবা অষ্টম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী যখন কোনো শিক্ষককে ঘিরে ধরে অপমান করে, হুমকি দেয় বা প্রকাশ্যে হেনস্তা করে, তখন ঘটনাটি শুধু একজন শিক্ষকের অসম্মানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা, শিশুদের নৈতিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ সামাজিক সম্পর্কের জন্যও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য শৃঙ্খলা ভাঙার প্রয়োজন নেই; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্তই হলো শৃঙ্খলা ও যথাযথ প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।
শিক্ষকদের রাজনৈতিক ব্যবহারও বন্ধ হওয়া জরুরি
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে, শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা। একজন শিক্ষক যখন নিজের ব্যক্তিগত সুবিধা, পদ রক্ষা কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থে শিক্ষার্থীদের আবেগকে ব্যবহার করেন, তখন তিনি শুধু পেশাগত দায়িত্বের সঙ্গে আপস করেন না; শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেন।
আজ যে শিক্ষার্থীকে তিনি নিজের স্বার্থে মাঠে নামাচ্ছেন, আগামীকাল সেই শিক্ষার্থীই ভিন্ন কোনো স্বার্থে তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। একইভাবে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি, বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কিংবা নিরাপত্তার প্রশ্নকে অগ্রাহ্য করাও গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষক হবেন শিক্ষার্থীর বিবেক জাগ্রत করার কারিগর, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার নন।
ক্যাম্পাসের ভাষা কি আমাদের ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি?
বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় মুক্তবুদ্ধি, জ্ঞানচর্চা ও মানবিক মূল্যবোধের কেন্দ্র। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অশালীন স্লোগান, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা প্রতিপক্ষকে হেয় করার ভিডিও দেখা যায়।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে অপমানকে স্বাভাবিক করে তুলছি? যে শিক্ষার্থী আজ ক্যাম্পাসে ভিন্নমতের কাউকে অশালীন ভাষায় আক্রমণ করছে, সে আগামীকাল কর্মক্ষেত্রে, পরিবারে বা রাষ্ট্রে মতভিন্নতা কীভাবে সামলাবে? মতবিরোধ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, কিন্তু কাউকে হেয় করা বা হুমকি দেওয়া সুস্থ সংস্কৃতির পরিচয় হতে পারে না।
পরিবার: সন্তান আমার, কিন্তু দায়িত্ব কি শুধু ভালোবাসায় শেষ?
এবার আসি পরিবারের কথায়। নগরায়ণ, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপনের কারণে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়েছে। এখন অনেক অভিভাবকের কাছে সন্তানের প্রতি ভালোবাসার অর্থ হয়ে দাঁড়িয়েছে তার সব কাজকে সমর্থন করা। সন্তান ভুল করলেও তাকে প্রশ্ন করা যাবে না, শাসন করা যাবে না, এমন মনোভাবের পরিবর্তন প্রয়োজন।
সন্তানের পাশে দাঁড়ানো মানে তার প্রতিটি ভুলকে বৈধতা দেওয়া নয়; বরং ভুল থেকে ফিরে আসার পথ দেখানো। নিজের সন্তানকে অন্যায় থেকে রক্ষা করতে গিয়ে যদি আমরা তাকে অন্যায় করার সাহস জোগাই, তাহলে শেষ পর্যন্ত তার ক্ষতিই করি।
তাহলে উত্তরণের পথ কী?
সমস্যার কথা বলা সহজ। কিন্তু সমাধানের পথ তৈরি করতে হলে পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে:
১. পরিবারে নৈতিক শিক্ষার চর্চা ফিরিয়ে আনতে হবে: মানুষকে তার পদ বা ক্ষমতার কারণে নয়, মানুষ হিসেবে সম্মান করতে হবে। বাবা-মায়েদের নিজেদের আচরণেও এর প্রতিফলন থাকতে হবে।
২. শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে: শিক্ষক হওয়ার কারণে কেউ জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নন। অন্যদিকে শিক্ষকদের ন্যায্য বেতন, নিরাপত্তা ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
৩. কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো অভিযোগ উঠলে তা প্রকাশ্যে অপমান না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল প্রতিবাদ শেখাতে হবে: প্রতিবাদ হবে যুক্তিনির্ভর, তথ্যভিত্তিক ও শালীন। কাউকে হুমকি দেওয়া বা জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা গ্রহণযোগ্য নয়।
৫. রাজনীতির স্বার্থে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে: শিক্ষার্থীদের আবেগ ও প্রতিবাদকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
৬. সামাজিক বন্ধন ও ডিজিটাল নাগরিকত্ব গড়ে তুলতে হবে: অন্ধ কর্তৃত্ব না ফিরিয়ে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসা করতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে ডিজিটাল নাগরিকত্বের শিক্ষা দিতে হবে।
৭. আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে: অপরাধ যার জন্যই হোক না কেন, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের কারণে যেন কেউ ছাড় না পায়।
শেষ কথা
আমি অতীতের সবকিছুকে আদর্শ মনে করি না। বর্তমান প্রজন্মের স্বাধীনচেতা মনোভাব ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসকে আমি ইতিবাচকভাবেই দেখি। কিন্তু স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচার নয়, অধিকার মানে দায়িত্বহীনতা নয়, আর প্রতিবাদ মানে অপমান নয়।
আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষক হবেন শ্রদ্ধার পাত্র, আর শিক্ষার্থী পাবে তার ন্যায্য অধিকার। শিক্ষা শুধু জীবিকা অর্জনের পথ নয়; শিক্ষা মানুষ হওয়ারও পথ। আমরা যদি সত্যিই একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ চাই, তাহলে শিক্ষকের মর্যাদা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি শিক্ষার পরিবেশ, পারিবারিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ পুনর্গঠনের কাজটি আজই শুরু করতে হবে।
মাজেদুর রহমান
সাংবাদিক ও কলাম লেখক