84 জন পড়েছেন
Writing
বগুড়ায় মেয়েকে উদ্ধারের আকুতি পুলিশ সদস্য বাবার, সুষ্ঠু তদন্তের দাবি
আদালত চত্বর ও থানায় অনিয়ম, স্ত্রীর শ্লীলতাহানি এবং মেয়েকে অন্যের হেফাজতে দেওয়ার অভিযোগ; তিন দফা দাবি
বগুড়া প্রতিনিধি: বগুড়ায় নিজের নাবালিকা মেয়েকে উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন আদমদীঘি থানায় কর্মরত পুলিশ কনস্টেবল মো. রানা মাসুদ। আদালতের আদেশের পর মেয়েকে নিয়ে যাওয়া, আদালত চত্বরে তাঁর স্ত্রীর ওপর হামলা ও শ্লীলতাহানি এবং থানা থেকে মেয়েকে অন্যের হেফাজতে দেওয়ার অভিযোগ তুলে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন তিনি। একই সঙ্গে মেয়ের প্রকৃত বয়স নির্ধারণে মেডিকেল বোর্ড গঠন ও তাকে সরকারি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে রাখার দাবি জানিয়েছেন এই পুলিশ সদস্য।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুর ১২টায় বগুড়া প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব দাবি জানান মো. রানা মাসুদ। তিনি আদমদীঘি থানায় কনস্টেবল পদে কর্মরত। তাঁর কনস্টেবল নম্বর ৮৯৩।
সংবাদ সম্মেলনে রানা মাসুদ বলেন, মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আকুতি নিয়েই তিনি সাংবাদিকদের সামনে হাজির হয়েছেন। তাঁর দাবি, মেয়ের বিয়ে, বয়স এবং আদালতের হেফাজতসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় তিনি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন।
আদালতের আদেশ ও বিয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
লিখিত বক্তব্যে রানা মাসুদ জানান, গত ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি আদালতে একটি আবেদন করেন। তাঁর অভিযোগ, ছেলে ও মেয়ের বয়স বিয়ের আইনগত শর্ত পূরণ না করায় তাদের বিয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাজি ও সাক্ষীদের আইনের আওতায় আনারও আবেদন করেন তিনি।
তাঁর দাবি, ওই আবেদনের পর আদালত ২৬ অক্টোবর বিয়ের কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। কিন্তু নির্ধারিত দিনে সংশ্লিষ্ট পক্ষ বিয়ের কাগজপত্র ও সাক্ষী হাজির করতে পারেনি বলে তিনি অভিযোগ করেন। পরে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত মেয়েকে তাঁর নিজের জিম্মায় দেওয়ার আদেশ দেন বলে দাবি করেন রানা মাসুদ।
তবে বিয়ের বৈধতা ও আদালতের আদেশের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আদালতের নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
আদালতকক্ষে মেয়ের স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ
রানা মাসুদের অভিযোগ, আদালতের কার্যক্রম শেষে বিচারক খাসকামরায় যাওয়ার পর কর্তব্যরত পুলিশ তাঁদের এজলাসকক্ষ থেকে বের করে দেয়। এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী তাঁর নাবালিকা মেয়ের কাছ থেকে কোনো একটি কাগজে স্বাক্ষর নেন বলে তিনি দাবি করেন।
পরে একজন সহকারী আইনজীবীর কাছে তিনি জানতে পারেন, ওই কাগজটি অগ্রিম ওকালতনামা হতে পারে। তবে ঠিক কোন কাগজে এবং কী উদ্দেশ্যে তাঁর মেয়ের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এ ঘটনায় আদালত চত্বরের সিসিটিভি ফুটেজ জব্দ করে তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
স্ত্রীর ওপর হামলা ও শ্লীলতাহানির অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে রানা মাসুদ অভিযোগ করেন, আদালতের আদেশের পর তাঁর মেয়ে তাঁদের গাড়িতে উঠতে গেলে কয়েকজন ব্যক্তি তাকে অন্য একটি গাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় তাঁর স্ত্রী বাধা দিলে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয় এবং কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর স্ত্রীর ওপর হামলা চালিয়ে পরনের কাপড় ছিঁড়ে শ্লীলতাহানি করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঘটনার ভিডিও তাঁর কাছে রয়েছে বলেও দাবি করেন রানা মাসুদ। ভিডিও ফুটেজ যাচাই করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
থানা থেকে মেয়েকে অন্যের হেফাজতে দেওয়ার অভিযোগ
রানা মাসুদ আরও অভিযোগ করেন, বগুড়া সদর থানায় গিয়ে তিনি মেয়েকে অন্য পক্ষের হেফাজতে না দেওয়ার অনুরোধ জানান। তাঁর দাবি, থানা কর্তৃপক্ষ প্রথমে মেয়েকে তাঁদের এলাকার একজন আইনজীবীর জিম্মায় দেওয়ার কথা বলেছিল।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর থানার প্রধান ফটকের সামনে একটি হাইস ও একটি ব্যক্তিগত গাড়ি আসে। পরে তাঁর মেয়েকে ওই গাড়িগুলোর একটিতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পেছনে পুলিশের একটি গাড়ি পাহারা দিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মেয়েকে কোথায় নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে থানা কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছে—এমন অভিযোগও করেন তিনি। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানার ভূমিকা তদন্তের দাবি জানান এই পুলিশ সদস্য।
মেয়ের বয়স, নিরাপত্তা ও চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ
লিখিত বক্তব্যে রানা মাসুদ দাবি করেন, তাঁর মেয়ের জন্মনিবন্ধনে উল্লেখিত বয়সের সঙ্গে প্রকৃত বয়সের পার্থক্য রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ের বয়স বর্তমানে ১৬ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। এ কারণে সরকারি মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে বয়স নির্ধারণের জন্য পরীক্ষা করানোর দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও দাবি করেন, মেয়েকে আটকে রেখে মাদক সেবন ও ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়ে থাকতে পারে। পাশাপাশি মেয়েকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা এবং ব্যক্তিগত ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগও তোলেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা চিকিৎসা প্রতিবেদন বা তদন্তের তথ্য সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করা যায়নি।
রানা মাসুদের দাবি, তাঁর মেয়ের নিরাপত্তা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে তাকে সরকারি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে রেখে নারী চিকিৎসকের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং করানো জরুরি।
৪২টি মোবাইল নম্বর পাওয়ার দাবি
সংবাদ সম্মেলনে রানা মাসুদ দাবি করেন, বগুড়া সদর থানায় মেয়ের পোশাক পরিবর্তনের সময় তার ফেলে যাওয়া পায়জামায় ৪২টি মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়। তাঁর প্রশ্ন, সরকারি হেফাজতে থাকা অবস্থায় মেয়ের কাছে এতগুলো নম্বর কীভাবে এল।
এসব নম্বরের কল রেকর্ড যাচাই করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং ঘটনার সঙ্গে কোনো অপরাধী চক্র জড়িত কি না, তা তদন্তের দাবি জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার আবেদন জানান রানা মাসুদ। নিজেকে একজন অসহায় বাবা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মেয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করাই তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য।
তিন দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে রানা মাসুদ তিনটি দাবি তুলে ধরেন। সেগুলো হলো—
১. তাঁর মেয়েকে বর্তমান হেফাজত থেকে উদ্ধার করে বগুড়া ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার অথবা সরকারি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো।
২. মেয়ের প্রকৃত বয়স নির্ধারণে সরকারি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো।
৩. নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে নারী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মেয়ের বক্তব্য গ্রহণ, কাউন্সেলিং ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি আদালত চত্বরের সিসিটিভি ফুটেজ, থানার ভিডিও এবং দাবি করা ৪২টি মোবাইল নম্বরের বিষয়ে তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা।